বাংলার ইতিহাস
বাংলা এক অনন্য জনপদ। হাজার বছরের ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই ভূখণ্ড আজকের বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে গঠিত। বঙ্গভূমি কখনো স্বাধীন রাজ্য, কখনো সাম্রাজ্যের অংশ, আবার কখনো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন ছিল। ভাষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, ধর্ম ও রাজনীতির প্রতিটি স্তরে বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। নিচে ধারাবাহিকভাবে বাংলার ইতিহাসের পূর্ণ বিবরণ দেওয়া হলো।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাস
বাংলার ইতিহাস শুরু হয় বৈদিক যুগেরও আগে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক ইতিহাসবিদেরা এই অঞ্চলকে গঙ্গারিডাই নামে উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন বাংলার তিনটি প্রধান জনপদ ছিল—পুণ্ড্র (বর্তমান উত্তরবঙ্গ), গৌড় (বর্তমান মুর্শিদাবাদ ও আশপাশের এলাকা) এবং সমতট (বর্তমান কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চল)।
মৌর্য সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২-১৮৫) বাংলাকে তাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে। অশোকের বৌদ্ধ ধর্মপ্রচার বাংলায় পৌঁছে যায় এবং এখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
গুপ্ত যুগে (৩২০-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) বাংলায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নতি হয়। তবে গুপ্তদের প্রভাব কমে এলে স্থানীয় ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো আবির্ভূত হয়।
পাল সাম্রাজ্য (৮ম-১২শ শতক) বাংলার ইতিহাসে অন্যতম সোনালি অধ্যায়। গোপাল পাল প্রথমে রাজত্ব শুরু করেন এবং ধর্মপাল, দেবপাল বাংলাকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপ দেন। পালরা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক। নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় তখন বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পায়।
সেন রাজবংশ (১১শ-১২শ শতক) হিন্দুধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করে। বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন উল্লেখযোগ্য সেন রাজা। তাদের আমলেই বাংলায় প্রথম "কায়স্থ" ও "ব্রাহ্মণ" শ্রেণির প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
মুসলিম শাসনামল
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি নালন্দা জয় করে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। এর ফলে বাংলায় ইসলাম ধর্ম বিস্তার লাভ করে।
বাংলার সুলতানি যুগ (১৩শ-১৬শ শতক) স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সময়। ইলিয়াস শাহ বংশ, হুসেন শাহ বংশ প্রভৃতি শাসক বাংলাকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। হুসেন শাহের আমলে চৈতন্যদেব ভক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
মুঘল আমল (১৬শ-১৮শ শতক) বাংলায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি আনে। বাংলাকে বলা হতো "সুবা বাংলার সোনার গাঁধা"। ঢাকাকে রাজধানী করা হয় (১৬১০ খ্রিস্টাব্দ)। বাংলার রেশম, মসলিন, চিনি, লবণ, নীল ও অন্যান্য দ্রব্য ইউরোপে রপ্তানি হতো। মুঘল আমলে বাংলার সমৃদ্ধিকে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা লোভনীয়ভাবে লক্ষ্য করে।
ইউরোপীয়দের আগমন ও ঔপনিবেশিক শাসন
১৫ শতকের শেষদিকে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা প্রথম বাংলায় আসে। পরে ডাচ, ফরাসি, ডেনিশ এবং সর্বশেষ ইংরেজরা আসে।
১৭৫৭ সালের প্লাসির যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ষড়যন্ত্রে পরাজিত হন। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা হারিয়ে যায়।
১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধ-এর পর বাংলার পূর্ণ শাসন ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ইংরেজরা বাংলাকে তাদের অর্থনৈতিক শোষণের কেন্দ্র বানায়। বাংলার কৃষকরা নীল চাষের শিকার হন, খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৭৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায়।
বাংলার নবজাগরণ
ব্রিটিশ শাসনকালেও বাংলায় এক নবজাগরণের সূচনা হয়। কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হয়ে ওঠে। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে।
রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বিলোপে ভূমিকা রাখেন।
ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সূচনা করেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্দেমাতরম্’ গান রচনা করে স্বাধীনতার বীজ বপন করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন এবং নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার ভূমিকা
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে বিভক্ত করেন। এর প্রতিবাদে বাংলায় স্বদেশি আন্দোলনের জন্ম হয়।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়, তবে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ বেড়ে যায়। বাংলার বাঘা যতীন, খুদিরাম বসু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, সূর্যসেন প্রমুখ বিপ্লবী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন করেন।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয় এবং পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়।
পাকিস্তান আমল ও ভাষা আন্দোলন
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলা হয় পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করতে থাকে।
১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে এবং সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার শহীদ হন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার মানুষ তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তির সংগ্রামের ডাক দেওয়া হয়।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। পরবর্তীতে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আধুনিক বাংলাদেশ
স্বাধীনতার পর নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। কৃষি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি হয়েছে। গার্মেন্টস শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বে শান্তিরক্ষী প্রেরণে শীর্ষ দেশ, আর ক্রিকেট ও সংস্কৃতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত।
Comments
Post a Comment